All History and Details of Ambubachi Festival and Rituals

অম্বুবাচীর ব্রতের মাঝে প্রাচীন পবিত্র ধর্মীয় ভাবাবেগ

জ্যোতিষ শাস্ত্র রাশিফল

আষাঢ়ের শুরুতেই এক ব্যতিক্রমী উৎসব অম্বুবাচী (Ambubachi)। গোটা ভারতের পূর্নলোভী মানুষরা ভক্ত ভরে পালন করে। কিন্তু এই ব্রতের মাঝে আছে নিয়মের নিক্তি ও …..

নিজস্ব সংবাদদাতা: ধর্মীয় ভাবাবেগের পীঠস্থান এই ভারতবর্ষ। নানা প্রান্তে বারো মাস ধরে চলতে থাকে ধর্মীয় উৎসব। অম্বুবাচী হিন্দুধর্মের বাৎসরিক উৎসব। আষাঢ় মাসে মৃগ শিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে পৃথিবী বা ধরিত্রী মা ঋতুময়ী হয়। এই সময়টিতে অম্বুবাচী (Ambubachi)পালিত হয়।

প্রবাদ ও বিশ্বাস

বাংলা প্রবাদে বলে, ‘কিসের বার কিসের তিথি, আষাঢ়ের সাত তারিখ অম্বুবাচী।’ এই দিন থেকেই শুরু হয় পবিত্র অম্বুবাচী উৎসব । জ্যোতিষ শাস্ত্র বলে, সূর্য যে বারের যে সময়ে মিথুন রাশিতে গমন করেন, তার পরবর্তী সেই বারের সেই কালে অম্বুবাচী হয়। ধরিত্রী মৃগশিরা নক্ষত্রের চতুর্থ পদে ঋতুমতী হন। ধরিত্রী মাতা বা পৃথিবীও অম্বুবাচীর পর শস্য শ্যামলা হয়ে ওঠেন। তিনি আমাদের সকলের জন্মদাত্রী।

প্রচলিত ধারণা মতে, এই সময় কৃষিকার্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। জমিতে লাঙ্গল চালানো, জমি খোঁড়া বা কৃষি কাজ থেকে বিরত থাকা হয়। সন্ন্যাসী ও বিধবারা এই তিন দিন, বিশেষ ভাবে পালন করে থাকেন। এই তিন দিন সমাজে মাঙ্গলিক কাজ করা হয় না। এই তিন দিন পর মাঙ্গলিক কাজ বা চাষের কাজে বাধা কেটে যায়। এই তিন দিন বন্ধ রাখা হয় সকল মন্দিরের দ্বার।

Kamakhya Mandir in Assam
Kamakhya Mandir in Assam

বিষয়ের গভীরে যে মতাদর্শ:

হিন্দু ধর্ম শাস্ত্রে পৃথিবীকে মা বলে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পৌরাণিক বেদে পৃথিবীকে মা রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। আবছা অতীতে পৃথিবীকে, ধরিত্রী মাতা বলে সম্বোধন করা হয়েছে। মহাজাগতিক ধারায় পৃথিবী, সূর্যের মিথুন রাশিস্থ আর্দ্রা নক্ষত্রে অবস্থান করে। তখন থেকে বর্ষাকাল শুরু হয়। আষাঢ মাসে রবি মিথুন রাশিস্থ আর্দ্রা নক্ষত্রের প্রথমপাদে পৃথিবী বা ধরিত্রী মা ঋতুময়ী হন।

[ আরো পড়ুন ] ১৫১ বছর পর কাল সর্পদোষ কাটছে কার কার ?

উর্বর কৃষিধারায় নারী এবং ধরিত্রী একাকার। সেই ধারণা থেকেই আষাঢ় মাসের শুরুতে পৃথিবী বা মাতা বসুমতী হন। আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে আকাশ মেঘে ঢেকে যায়। বর্ষার নতুন জলে সিক্ত হয়ে ওঠেন ঋতুমতী নারী রূপে ভুবনডাঙ্গা ৷ আর তখন শুরু হয় অম্বুবাচীর শুভ প্রবৃত্তি। ঠিক তিন দিন পরে শেষ অম্বুবাচী নিবৃত্তি।

প্রাচীন কাল থেকেই এই নিবৃত্তির পর জমিতে চাষ শুরু করতেন কৃষকেরা। প্রচলিত ধারণায় , ঋতুকালে মেয়েরা অশুচি থাকেন। সেইরকম পৃথিবীও এই অম্বুবাচী বা অমাবতির তিন দিন অশুচি থাকেন। চাষিরা আর মাঠে যান না। দেশের অনেক জায়গাতেই এই নিয়ম মেনে চলা হয়।

রজঃউৎসব নামে পালিত:

ভারতের নানা জায়গায় এই অম্বুবাচী, রজঃউৎসব নামে পালিত হয়। ভারতবর্ষে অনেকেই ব্রহ্মচর্য পালন করেন। ব্রহ্মচারী, সাধু, সন্ন্যাসী,যোগীপুরুষ, বিধবা মহিলারা ‘অশুচি’ পৃথিবীর উপর আগুনের রান্না সামগ্রী খান না। তারা নানাপ্রকার ফলমূল খেয়ে এই তিন দিন কাটান। এই কারণে বয়স্ক বিধবা মহিলাদের তিন দিন ধরে অম্বুবাচী উপলক্ষ্যে ব্রত পালন করতে দেখা যায় ৷

Kamakhya madir during Ambubachi mela
Kamakhya madir during Ambubachi mela

পালনীয় ও বিরত থাকার পর্ব:

পবিত্র এই অম্বুবাচীতে গুরু প্রদত্ত ইষ্টমন্ত্র জপ করুন। অম্বুবাচীতে সৌভাগ্যকুণ্ডের ধারে গণেশ বিগ্রহ দর্শন করুন। বিশুদ্ধ আচার এনে ভক্তি ভরে পূজা করুন। সৌভাগ্যকুণ্ডের পশ্চিমদিকে বিধিপূর্বক স্নান ও তর্পণ করুন। অম্বুবাচীতে বিধিপূর্বক অগ্নিস্থাপন করে ইষ্ট মন্ত্রে হোম করুন।

কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে:

মধ্যরাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে প্রার্থনা জানান দেবী কামাক্ষ্যাকে। এতে যেকোনো মানুষের মনস্কামনা পূরণ হয়। সর্পভয় নিবারণের জন্য এইসময় আম ও দুধ সেবন করুন। আম ও দুধ খেলে এক বছর সাপের ভয় থাকে না। দৈনিক আহারের দিকে নজর দিন। ফলমূল আহারেই শরীর সতেজ থাকবে।

শুভ কাজ থেকে বিরত:

অম্বুবাচীতে ভূমিকর্ষণ ও বৃক্ষরোপণ একেবারে নিষেধ। গৃহপ্রবেশ, বিবাহ ও অন্যান্য শুভ কাজ থেকে বিরত থাকবেন। এই সময়ে নিত্যকর্ম (রথযাত্রা) হবে কিন্তু কাম্য কর্ম হবে না। আদি শক্তির বিভিন্ন (কালী, দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, বিপত্তারিণী, শীতলা, চণ্ডী) মূর্তি বা পট লাল কাপড়ে ঢেকে রাখবেন।

[ আরও পড়ুন ] জেনে নিন কোন রাশির জাতক জাতিকাদের এই 2020 সাল কেমন যাবে।

মন্ত্র পাঠ না করে, কেবল ধূপ-দীপ দেখিয়ে প্রণাম করবেন। তুলসি গাছের গোড়া বেশি মাটি দিয়ে উঁচু করবেন। অম্বুবাচীর নিবৃত্তির পর আচ্ছাদন খুলে ফেলবেন। আসন ধুয়ে দেবীকে স্নান করিয়ে দেবেন। এরপর আগের মতো পূজা ও আম-দুধ নিবেদন করবেন।

অম্বুবাচীর পবিত্র ক্ষেত্র কামাখ্যা:

কামাখ্যা মন্দির আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরের পশ্চিমাংশে নীলাচল পর্বতে অবস্থিত। এটি ৫১ সতীপীঠের অন্যতম। ৫১টি শক্তি পীঠের মধ্যে একটিতে এবং ৪টি আদি শক্তি পিঠগুলির মধ্যে, কামাখ্য মন্দিরটি প্রসিদ্ধ।দেবী সতীর গর্ভ এবং যোনি এখানে পড়েছি। তাই দেবী কামাখ্যাকে উর্বরতার দেবী বা “রক্তক্ষরণকারী দেবী” বলা হয।

দশমহাবিদ্যার মন্দির:

এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দির আছে। এই মন্দিরগুলিতে দশমহাবিদ্যা অর্থাৎ ভুবনেশ্বরী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ত্রিপুরাসুন্দরী, তারা, কালী, ভৈরবী, ধূমাবতী, মাতঙ্গী ও কমলা পূজিত হন। মন্দিরে চারটি কক্ষ আছে। গর্ভগৃহ ও তিনটি মণ্ডপ (চলন্ত, পঞ্চরত্ন ও নাটমন্দির) আছে। এই গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী।

গর্ভগৃহটি আসলে ভূগর্ভস্থ একটি গুহা। এখানে কোনো মূর্তি নেই। একটি পাথরের সরু গর্ত দেখা যায়। এই গর্ভগৃহটি খুব ছোটো ও অন্ধকারময়। সরু খাড়াই সিঁড়ি ধরে সেখানে পৌঁছাতে হয়। ভিতরে ঢালু পাথরের একটি খণ্ড আছে। এটি অনেকটা যোনির আকৃতিবিশিষ্ট।

Kamakhya Devi worshiped here as Yoni by devotees
Kamakhya Devi worshiped here as Yoni by devotees

দেবীর ঋতুমতী হওয়া:

এটিতে প্রায় দশ ইঞ্চি গভীর একটি গর্ত আছে। একটি ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল বেরিয়ে এই গর্তটি সর্বদা ভর্তি রাখে। এই গর্তটিই দেবী কামাখ্যা নামে পূজিত ও দেবীর পীঠ হিসেবে প্রসিদ্ধ। মন্দিরের বাইরে গণেশ ও অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীদের মূর্তি খোদিত আছে। অম্বুবাচী মেলার সময় কামাখ্যা দেবীর ঋতুমতী হওয়ার ঘটনাকে উদযাপন করা হয়।

বারাণসীর বৈদিক ঋষি বাৎস্যায়ন খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে নেপালের রাজার দ্বারস্থ হন। উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলিকে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত ও নরবলি প্রথার বিকল্প চালু করার অনুরোধ করেন। বাৎস্যায়নের মতে, পূর্ব হিমালয়ের গারো পাহাড়ে দেবীর তান্ত্রিক পূজা প্রচলিত ছিল।

‘কামাকি’ নামে পূজা:

আদিবাসীরা দেবীর যোনিকে ‘কামাকি’ নামে পূজা করত। ব্রাহ্মণ্যযুগে কালিকাপুরাণে সব দেবীকেই মহাশক্তির অংশ ধরা হয়। তাই কামাক্ষ্যা মহাশক্তির অংশ হিসেবে পূজিত হন। কালিকা পুরাণের মতে, কামাখ্যা মন্দিরে সতী শিবের সঙ্গে বিহার করেন। এখানে তার মৃতদেহের যোনি অংশটি বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রে ছিন্ন হয়ে পড়ে।

দেবীভাগবত পুরাণ:

আবার প্রসিদ্ধ দেবীভাগবত পুরাণের ১০৮ পীঠের তালিকায় এই তীর্থের নাম নেই। তবে অপর একটি তালিকায় কামাখ্যা নাম পাওয়া যায়। যোগিনী তন্ত্রে কালিকা পুরাণের মতকে অগ্রাহ্য করে কামাখ্যা কালী বলা হয়েছে। যোনির প্রতীকতত্ত্বের উপর বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিশ্রণ:

১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নীলাচল পর্বতে মঙ্গোলরা আক্রমণ করে। সেই সময় প্রথম তান্ত্রিক কামাখ্যা মন্দিরটি ধ্বংস হয় । দ্বিতীয় তান্ত্রিক মন্দিরটি ধ্বংস হয় মুসলমান আক্রমণের সময়। আসামের দেবী কামাখ্যার পূজাতে আর্য ও অনার্য সংস্কৃতির মিশ্রণ দেখা যায়। দেবীর অনেক স্থানীয় আর্য ও অনার্য দেবদেবীর নাম আছে।

যোগিনী তন্ত্র অনুসারে, এই যোগিনী পীঠের ধর্মের উৎস আসলে কিরাতদের ধর্ম। গারো উপজাতির মানুষেরা কামাখ্যায় শূকর বলি দিত। এই প্রথা কিছু পুরোহিতদের মধ্যেও প্রচলন ছিল। কামাখ্যার পূজা বামাচার ও দক্ষিণাচার উভয় মতেই হয়। সাধারণত ফুল দিয়ে এই পূজা দেওয়া হয়। এখানে পশুবলি হলেও স্ত্রীপশু বলি নিষিদ্ধ।

২০২০ সালের অম্বুবাচীর নির্ঘন্ট:

২২শে জুন সোমবার, বাংলার ৭ই আষাঢ় সকাল ৭টা ৫৪ মিনিটে আরম্ভ অম্বুবাচী (Ambubachi)। আর সমাপ্ত হবে ২৫শে জুন বৃগস্পতিবার অর্থাৎ ১০ই আষাঢ় রাত ৮টা ১৮ মিনিটে। ১৭ শতাব্দী থেকে চলে আসা এই মেলার ইতিহাসে এই প্রথমবার বন্ধ রাখা হয়েছে। মন্দির বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে প্রথা মেনে সমস্ত রীতি ও আচার পালন করা হচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *