বিপত্তারিণী পুজো – দেবী সঙ্কটনাশিনীর রূপ

জ্যোতিষ শাস্ত্র রাশিফল

হিন্দুরা মূলত বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য ভতি ভরে এই দেবীর পূজা (Bipodtarini Puja) করেন। আষাঢ় মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে হিন্দু মহিলারা বিপত্তারিণী ব্রত …

সর্বমঙ্গলা মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে ।
শরণ্যে ত্রম্ব্যকে গৌরি নারায়নী নমস্তুতেঃ।।
সৃষ্টি-স্থিতি বিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি।
গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোহস্তুতে॥
শরণাগত দীনার্ত পরিত্রাণ পরায়ণে।
সর্বস্যার্তি হরে দেবী নারায়ণী নমস্তুতে ।।
– Bipodtarini Puja

কল্যাণময়ী মা দুর্গার আর এক রূপ মা বিপত্তারিণী চণ্ডী। সঙ্কটনাশিনীর এর রূপ এই দেবী। দুর্গার ১০৮ অবতারের অন্যতম মা বিপত্তারিণী। হিন্দুরা মূলত বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য ভতি ভরে এই দেবীর পূজা (Bipodtarini Puja) করেন। আষাঢ় মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে হিন্দু মহিলারা বিপত্তারিণী ব্রত পালন করেন। পুজো আষাঢ় মাসের যে শনিবার বা মঙ্গলবার পড়ে, সেই দিন বিপত্তারিণী ব্রত করা হয়।

মায়ের রূপের মহিমা:

স্ত্রীলোকেরা মনে মনে যা চেয়ে এই ব্রত করেন, তাঁদের সেই মনস্কামনা সফল হয়। বিপত্তারিণী পূজা চারদিন ধরে চলে। প্রথম দিনে দেবীর “আরাধনা” করা হয়। তারপর দুই রাত্রি ধরে রাতে বাংলা লোকগান, ভজন ও কীর্তন চলে। চতুর্থ দিনে এই পুজোর সমাপ্তি বা বিসর্জন হয়।

Bipodtarini Puja Mantra and Hindu Mythology
Bipodtarini Puja Mantra and Hindu Mythology

পুরাণের কথা:

দেবী দুর্গাই হলেন মা বিপত্তারিণী। হিন্দু পুরাণে তিনি কৌষিকীদেবী নামে প্রসিদ্ধ। দেবীর উৎপত্তি হয় ভগবান শিবের অর্ধাঙ্গিনী দেবী পার্বতীর কোষিকা থেকে। সেও কারণেই দেবীর ওপর নাম কৌষিকী। শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামক দুই অসুর ছিল। তাদের পরাক্রমে স্বর্গের দেবতারা পরাজিত হন।

বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হিমালয়ে গিয়ে মহামায়ার স্তব করেন। ভগবতী পার্বতীসেই স্তব শুনে জানান – “ এই সময় আপনারা এখানে কার স্তব করিতেছেন? ” তখনই ভগবতী পার্বতীর শরীর থেকে এক জন দেবীর আবির্ভাব হয়। সেই আবির্ভূতা দেবী জানালেন – “ ইহারা সকলে আমারাই স্তব করিতেছেন।”

[ আরো পড়ুন ] ১৫১ বছর পর কাল সর্পদোষ কাটছে কার কার ?

এই দেবী প্রবল যুদ্ধে শুম্ভ ও নিশুম্ভদের বধ করেন। দেবী শুম্ভাসুরকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করে বলেন- “ ঐকেবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা। পশ্যৈতা দুষ্ট ময্যেব বিশন্তো মদবিভূতয়ঃ ।। ” অর্থাৎ এই জগতে এক আমি আছি । আমি ব্যাতিত আমার সাহায্যকারিনী কেউ নেই। ব্রহ্মাণী প্রভৃতি শক্তি আমারই অভিন্না শক্তি । তারা আমার সঙ্গে মিশে থাকে। সর্বশক্তিমান দেবীর নব রূপের পরিচিতি ঘটে।

ধর্মীয় গাঁথা:

আর একটি গাঁথায় আছে অন্য বর্ণনা। ভগবান মহাদেব, দেবী পার্বতীকে ‘কালী’ বলে উপহাস করেন। দেবী উত্তেজিত হয়ে তপস্যার মাধ্যমে “কৃষ্ণবর্ণা” রূপ পরিত্যাগ করেন। সেই কৃষ্ণবর্ণা দেবীই হলেন, জয়দুর্গা, কৌষিকীদেবী বা বিপদতারিনীদুর্গা। এই দেবীর ধ্যান মন্ত্র – ওঁ কালাভ্রাভাং কটাক্ষৈররিকুলভয়দাং মৌলীবন্ধেন্দুরেখাম্ । শঙ্খং চক্রং কৃপাণং ত্রিশিখমপি করৈরুদ্বহন্তীং ত্রিনেত্রাম্ । সিংহাস্কন্ধাধিরুঢ়াং ত্রিভুবন – মখিলং তেজসা পুরয়ন্তীম্। ধ্যায়েদ্ দুর্গাং জয়াখ্যাং ত্রিদশপরিবৃতাং সেবিতাং সিদ্ধিকামৈঃ।

এই কৌষিকীদেবী বা বিপদতারিনীদুর্গা আসলে পঞ্চদেবতার একজন। কালের নিয়মে দেবীর একাধিক রূপ দেখা যায়। উত্তর ভারতে অষ্টাদশ রূপের ধ্যান ও পূজা হয়। আবার তিনি দশভুজা রূপে ,চতুর্ভুজা স্বর্ণ বর্ণ ও কৃষ্ণ বর্ণা রূপে পূজিতা হন। দেবী বিপত্তারিণীর রূপের সঙ্গে দেবী সংকটতারিণী বা মাতা সংকটার সাদৃশ্য আছে। কোথাও তিনি শঙ্খ-চক্র-শূল ও অসিহস্তা স্বর্ণবর্ণা ত্রিনয়না, আবার কোথাও তিনি খড়গ-শূল-বরাভয়ধারিণী লোলজিহ্বা ঘোরকৃষ্ণা।

মূলত মঙ্গল ও শণিবারে এই মায়ের পূজো হয়। তিনি সকলের সর্ব প্রকার বিপদনাশ করে, জগতের মঙ্গলসাধন করেন ।

পূজার আচার:

বাংলা আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া থেকে নবমী তিথিতে এই পুজো হয়। শনি বা মঙ্গল বারে এই ব্রত শ্রদ্ধার সাথে পালন করা হয়। বিপত্তারিণী ব্রত পালনের আগের দিন নিয়ম মেনে হবিষ্য করা উচিত। অবশ্য নিরামিষ আহারও করা যায়। ১৩ রকম ফুল, ১৩ রকম ফল, ১৩টি পান, ১৩টি সুপারি এবং ১৩ গাছা লাল সুতোতে ১৩ গাছা দূর্বা সহযোগে ১৩টি গিঁট বেঁধে ডুরি তৈরি করতে হয়।

[ আরো পড়ুন ] অম্বুবাচীর ব্রতের মাঝে প্রাচীন পবিত্র ধর্মীয় ভাবাবেগ

আম্রপল্লব-সহ ঘট স্থাপন করে ব্রাহ্মণ দ্বারা নাম গোত্র জানিয়ে পূজা দিতে হয়। শেষে মা বিপত্তারিণী দেবীর ব্রতকথা শুনতে হবে। সেই লাল সুতোর ডুরি পুরুষদের ক্ষেত্রে ডান এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে বাম হাতে ধারণ করতে হয়। মহিলাদের এই ব্রত কমপক্ষে ৩ বছর পালন করা নিয়ম। এই বিপত্তারিণী ব্রত পালনে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়। সকল বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। ভক্তের জীবনে সুখ, শান্তি এবং সমৃদ্ধি রচিত হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *