Biography of British Indian novelist Salman Rushdie

Salman Rushdie: বিতর্কিত সাহিত্যিক সালমান রুশদি

ইতিহাস

ব্যতিক্রমী ও বিতর্কিত সুসাহিত্যিকের নাম সালমান রুশদি (Salman Rushdie)। তিনি বিশ্ব সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় ও তুখোড় লেখক হিসেবে পরিচিত।

নিজস্ব প্রতিবেদন: একেবারেই চেনা গোত্রের বাইরে থাকা মানুষ। সাহিত্যের ভান্ডারকে উর্বর করেছেন স্বচ্ছ সরসতা ও সাবলীল ভঙ্গিতে। কলম আর মগজের মেলবন্ধনে গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছেন। সেই ব্যতিক্রমী ও বিতর্কিত সুসাহিত্যিকের নাম সালমান রুশদি (Salman Rushdie)। তিনি বিশ্ব সাহিত্যের একজন জনপ্রিয় ও তুখোড় লেখক হিসেবে পরিচিত। কাশ্মীরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান এই সালমান রুশদি। তার ব্যাক্তিগত জীবনও গুঞ্জনে ভরা।

So many girlfriends and 4 wives of Rusdie always get place in any page3
So many girlfriends and 4 wives of Rusdie always get place in any page3

ব্রিটিশ ভারতীয় ঔপন্যাসিক:

তিনি মূলত একজন ব্রিটিশ ভারতীয় ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক। বাস্তবতার সাথে ঐতিহাসিক কল্পকাহিনী একত্রিত করতে সিদ্ধহস্ত। পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে অসংখ্য সংযোগ, বিচ্ছিন্নতা ও অভিপ্রয়াণ রুশদির কল্পনার বিষয়বস্তু। সাহসী দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি ধর্মের সংজ্ঞা ও ব্যবহারের ধারাকে বদলে দিতে চেয়েছিলেন। মৃত্যু পরোয়ানা ঘোষিত হয়। তবু “হার মানা হার” মানসিকতায় পুষ্ট হয়ে তিনি তার সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

রুশদির জন্ম ও শিক্ষা:

আহমেদ সালমান রুশদি ১৯৪৭ সালের ১৯শে জুন মুম্বাইতে জন্ম গ্রহন করেন। তার বাবা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে ব্যবসা করেন। মা ছিলেন একজন শিক্ষিকা। মুম্বাইয়ের শীর্ষ স্কুল থেকে তিনি পড়াশোনা করেন। এরপর লন্ডনের কিংস কলেজে ভর্তি হন। ইতিহাস নিয়ে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন।

Young Salman Rushdie
Young Salman Rushdie

কপিরাইটার রুশদি:

ছোটবেলা থেকেই হলিউড সিনেমার অভিনেতা হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কর্মজীবন শুরু করেন একজন সাধারণ কপিরাইটার হিসেবে। বেশ কিছু বিজ্ঞাপনী সংস্থার জন্য মনজয়কারী বাণী লিখে সুমন অর্জন করেন। ক্রিম কেকের জন্য ‘নটি বাট নাইস’, আমেরিকান এক্সপ্রেসের জন্য ‘দ্যাট উইল ডু নাইসলি’ স্লোগান বিখ্যাত হয়। এই কাজের মধ্যেই নিজে লেখতে শুরু করেন উপন্যাস। জীবনের ধারা পাল্টাতে শুরু করে।

রুশদির সাহিত্যসম্ভার:

সালমান রুশদির প্রথম উপন্যাস “গ্রিমাস”। ১৯৭৫ সালের সায়েন্স ফিকশন ঘরানার এই বইটি প্রকাশ পায়। তার দ্বিতীয় বই ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে। এই উপন্যাসটি প্রকাশ হওয়ার পর তিনি নজর কাড়ত শুরু করেন। বিশ্ব জুড়ে অগণিত পাঠক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের প্রশংসা সালমান রুশদিকে এনে দেয় “বুকার” সম্মান। এই পুরস্কার সালমান রুশদির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

[ আরও পড়ুন ] বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের সবচেয়ে বড় ইংরেজী কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস

ভারতের এক অসাধারণ শিশুর চমকপ্রদ ক্ষমতার গল্প নিয়ে তৈরি হয় উপন্যাসটি। সূর্যাস্তের সময় জন্মানো শিশুদের এই জাদুকরী ক্ষমতা নির্ভর গল্পের খেলা এর উপভোগ্য ও চমকপ্রদ বিষয়। রুশদির তৃতীয় বই ‘শেম’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে। পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টু ও জেনারেল জিয়াউল হকের চরিত্র ও ঘটনা এই উপন্যাসের বিষয় ।

Riot in Pakistan against Salman Rushdie
Riot in Pakistan against Salman Rushdie

স্যাটানিক ভার্সেস:

তবে সালমান রুশদির চতুর্থ উপন্যাস ‘স্যাটানিক ভার্সেস’। ১৯৮৮ সালের এই লেখাতেই তিনি গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েন। বিশ্বব্যাপী আলোচনা-সমালোচনা, নিন্দা-ক্ষোভ ও বিতর্কের ঝড় ওঠে। । যুক্তরাজ্য তাকে পঞ্চাশ দশকের পর সেরা ৫০ লেখকের তালিকায় উঠে আসেন। মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে তিনি নিন্দিত হন। ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসে ইসলাম ও নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কটাক্ষ করে লেখা।

The Satanic Verses by Salman Rushdie
The Satanic Verses by Salman Rushdie

মৃত্যুদণ্ড ফতোয়া জারি:

বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৩টি দেশে এই বই নিষিদ্ধ করা হয়। মুসলমানদের বিক্ষোভের মুখে ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি স্যাটানিক ভার্সেস বইয়ের লেখক সালমান রুশদিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ফতোয়া জারি করেন। যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত ৭৮টি বইয়ের দোকানে হামলার হুমকি দেওয়া হয়। রুশদিকে আশ্রয় দেওয়ায় ইরান যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে।

‘নাইট’ উপাধি:

স্যাটানিক ভার্সেস প্রকাশ হওয়ার আগেই বইটির প্রকাশক “ভাইকিং পেঙ্গুইন” হুমকিপত্র পান। সেই হুমকির চিঠিতে জানানো হয়, ‘প্রকাশকের জন্য সাবধান বাণী, বইটি চরম বিতর্কের সূত্রপাত ঘটাবে।’ রুশদির বেশির ভাগ উপন্যাসই ইতিহাস আর জাদু ও বাস্তবতার মিশেল। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০৭ সালে ব্রিটেনের রানী তাকে ‘নাইট’ উপাধি দেন।

Salman Rushdie got Knighthood from queen of UK
Salman Rushdie got Knighthood from queen of UK

ছোটগল্পের সংকলন:

১৯৮৮ সালের এই বইটির পর তার ছোটগল্পের একটি সংকলন বের হয় ১৯৯৪ সালে। ১৯৯৫ সালে ‘দ্য মুরস লাস্ট সাই’, ১৯৯৯ সালে ‘দ্য গ্রাউন্ড বিনেথ হার ফিট’ প্রকাশ হয়। এই বইটিতে গীতিকথা যোগ থাকায় আলোচনার তৈরি হয়। ২০০১ সালে উপন্যাস ‘ফিউরি’। ২০০৫ সালে তার ‘শালিমার দ্য ক্রাউন’ ভারতসহ গোটাবিশ্বে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়।

[ আরও পড়ুন ] ব্যতিক্রমী কবিদের মধ্যে অন্যতম রবার্ট ব্রাউনিং

বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার:

গোটাবিশ্বের পাঠকরা বইটি প্রবল আগ্রহে সংগ্রহ করেন ও প্রশংসায় ভাসান। সাহিত্যবোদ্ধারাও আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম সেরা কাজ বলে অভিহিত করেন। তার ‘লুকা অ্যান্ড দ্য ফায়ার অব লাইফ’ ২০১০ সালে প্রকাশিত হয়। বিতর্কিত এই লেখক লেখালেখি ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি লেকচার দেন। তরুণ শিক্ষার্থী ও পাঠকদের কাছে তনি বিতর্কিত হলেও বেশ জনপ্রিয়।

Salman Rushdie also lectured in various universities
Salman Rushdie also lectured in various universities

শালিমার দ্য ক্রাউন:

তারপর ২০০৫ সালে ‘শালিমার দ্য ক্রাউন’ ভারতসহ গোটাবিশ্বে প্রশংসা কুড়িয়ে নেয়। এটিকে বিশ্বের সকল সাহিত্যবোদ্ধারাও আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম আখ্যান বলে মনে করেন। ২০১০ সালে ‘লুকা অ্যান্ড দ্য ফায়ার অব লাইফ’ প্রকাশিত হয়। এসবের মধ্যেও তিনি বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্তও আছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভাষণ দেন। তিনি আপামর তরুণ শিক্ষার্থী ও ভক্ত পাঠকদের কাছে বিতর্কিত হলেও তুমুল জনপ্রিয়।

গুঞ্জন, প্রেম ও বিয়ে:

লেখার সাথে ব্যক্তিগত জীবন ঘিরেও আছে বিতর্কের জাল। রুশদি সম্পর্কে তার সাবেক স্ত্রী পদ্মলক্ষ্ণী জানান , সালমান রুশদি একজন ঈর্ষাকাতর, লোভী ও কামুক মানুষ। প্রত্যেক বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিততে ব্যর্থ হওয়ার পর রুশদি অচেনা হয়ে ওঠেন। তাকে শান্ত করতে তার খুব সমস্যা হতো। শুধুমাত্র ঈর্ষা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি রুশদির সংস্পর্শ ছাড়েন।

Salman Rushdie with his former wife Padma Lakshmi
Salman Rushdie with his former wife Padma Lakshmi

চার বার বিয়ে:

রুশদি মোট চার বার বিয়ে করেন। তার প্রথম স্ত্রীর নাম ক্লারিসা। লেখক হওয়ার আগেই এই বিয়ে করেছিলেন । এই দাম্পত্য জীবনে এক পুত্রসন্তান ছিল। আশির দশকের মাঝামাঝি বিচ্ছেদ হয়। এরপর আমেরিকান ঔপন্যাসিক মেরিনের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে করেন রুশদি। কিন্তু ১৯৯৩ সালে তাদের বিচ্ছেদ ঘটে। কয়েক বছর পর ১৯৯৭ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন ওই বিতর্কিত ঔপন্যাসিক।

Salman Rushdie with his second wife Marianne
Salman Rushdie with his second wife Marianne

তৃতীয় বিয়ের পাত্রী এলিজাবেথ ওয়েস্ট। দুজন ৭ বছর সংসার করেন। এই সংসারে আরেকটি পুত্রসন্তান আসে। ২০০৪ সালে তৃতীয় বারের বিচ্ছেদ হয়। তারপর চতুর্থ বিয়ে করেন ভারতীয় আমেরিকান অভিনেত্রী, মডেল, উপস্থাপিকা পদ্ম লক্ষ্মীকে। অভিনেত্রী রিয়া সেনের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা জানা যায়। সালমান রুশদি বর্তমানে নিউইয়র্কে বসবাস করছেন।

Salman Rushdie with his third wife Elizabeth West
Salman Rushdie with his third wife Elizabeth West

রুশদির রাজনৈতিক মতাদর্শ:

শুধু লেখার মধ্যে তিনি ডুবে ছিলেন না। সমগ্র বিশ্বের রাজনীতিকে জানা ও বোঝার চেষ্টা করেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও আদর্শের বিষয়ে সরব হয়েছেন। ১৯৮০ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টিকে সমর্থন দেন। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক দলে বারাক ওবামাকে সমর্থন করেন। একই সাথে পরিস্থিতি বুঝে সমালোচনা করেছেন রিপাবলিকানদের।

[ আরও পড়ুন ] গণিতজ্ঞ, কবি, জ্যোতির্বিদ ওমর খৈয়াম

ভারতীয় রাজনীতি নিয়েও তিনি নীরব ছিলেন না। ভারতীয় জনতা দল এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। ব্রেক্সিট আন্দোলনে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে পরামর্শ দেন। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে তালিবান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সোচ্চার হন। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক হামলার সমালোচনা করেন।

একই সাথে রুশদি, সাদ্দাম হোসেনের পতন ও হত্যার বিষয় নিয়েও সরব হন। সশস্ত্র শিয়া মুসলিম দল হিজবুল্লাহ ১৯৮৯ সালের ৩রা আগস্ট লন্ডনে তাকে হত্যার উদ্দেশে হামলা করে। একটি বইয়ের ভিতর আরডিএক্স বোম নিয়ে একজন আততায়ী সেন্ট্রাল লন্ডনের প্যাডিংটন হোটেলে আসে। ভয়াবহ হামলায় হোটেলের দুটি তলা ধসে যায়। কিন্তু রুশদি বেঁচে যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *