History of vimana and rath in mythology and Indian history

রথের ইতিহাস: পুরান, বিমান, বিজ্ঞান থেকে রাজরাজা

ইতিহাস

শাসকের পরাক্রম ও প্রাচুর্যের মহিমা ফুটে উঠতো রথের (Vimana and Rath) সাজে ও বাহারে। রথের উপরে পতাকা দিয়েই চেনা যেত সেই যোদ্ধা ও তার রাজত্বকে।

নিজস্ব প্রতিবেদন: চার চাকা বিশিষ্ট ঘোড়ায় টানা যানকে রথ বলে। বহু প্রাচীনকাল থেকেই রথের প্রচলন ছিল। সাধারণত অভিজাত শ্রেণীর ঘোড়ার গাড়িকে রথ বলা হয়। তবে এসব শুধু রাজা ও সেনাবাহিনীর মানুষেরা ব্যবহার করতো। শাসকের পরাক্রম ও প্রাচুর্যের মহিমা ফুটে উঠতো রথের (Vimana and Rath) সাজে ও বাহারে। রথের উপরে পতাকা দিয়েই চেনা যেত সেই যোদ্ধা ও তার রাজত্বকে। ভারতের দুই মহাকাব্যে ও পৌরাণিক গাঁথায় রথের অনেক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে রথ শব্দের অর্থ কিন্তু ভিন্ন। গুরুত্ব এবং শ্রদ্ধার দিক থেকে অনেকটা উপরে। তারা বিশ্বাস করে, রথ একটি কাঠের তৈরি যান, যাতে চড়ে স্বয়ং ভগবান যাতায়াত করেন। ভগবানের এই রথারোহণ ‘রথ যাত্রা’ নামে পরিচিত। যুগ যুগ ধরে সুসজ্জিত রথ রয়ে গেছে আমাদের সুবিশাল ইতিহাসে, ধর্মীয় লোকাচারে, সাহিত্যে কাব্যে ও গবেষণায়।

History of vimana and rath in mythology and Indian history
History of vimana and rath in mythology and Indian history

পুষ্পক রথ:

হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণে আছে পুষ্পক বিমান বা একপ্রকার আকাশযানের কথা। লঙ্কার রাজা রাবণ দূরবর্তী স্থানে যাতায়াতের জন্য এটি ব্যবহার করতেন৷ সীতাহরণকালে রাবণের পুষ্পক বিমান ব্যবহারের উল্লেখ আছে ৷ এই রথ মূলত ধনৈশ্বর্যের দেবতা কুবেরের। এই পুষ্পক রথের নকশাকর ও সংরক্ষক ছিলেন অঙ্গিরা মুনি। এই রথের নির্মাতা ও সাজসজ্জা করেন দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ৷ প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু পুরাণ অনুসারে প্রায় দশ হাজার বছর পূর্বেই এই রথের বিবরণ আছে।

Pushpak Viman
Pushpak Viman

পুষ্পক রথের গুণাবলী:

পুষ্পক রথের একাধিক গুণাবলী ছিলো। প্রয়োজন মতো এই বিমানের আকার হ্রাস বা বৃদ্ধি করা সম্ভব ছিল। ৷ দ্রুত ভ্রমনের জন্য এই বিমানৈর বেগ মাত্রাতিরিক্ত ভাবে বাড়ানো যেতো। আকাশপথ ছাড়া মাটিতেও রথ চলতে পারতো। একসাথে বহুলোকের জন্য জায়গা তৈরীর ব্যবস্থা ছিলো। যাত্রী সংখ্যা, বায়ুর বেগ ও গতিবিধির ওপর ভিত্তি করে এর আকার পরিবর্তন করা সম্ভন ছিল। এই রথ নির্মাণে তিনটি ধাতুর ব্যবহার হতো – সোনা, রূপা এবং লোহা। এই রথের বিমানের মৌলিক আকার ছিলো মাছরাঙ্গা পাখির মতো।

Pushpaka Vimana
Pushpaka Vimana

মহাভারতের পঞ্চরথ:

মহাকাব্য মহাভারতের রথী মহারথীদের অসাধারণ রথ ছিল। আঠারো দিনের যুদ্ধে সকল রথ নিয়ে যুধ্যে নামেন দুই পক্ষ। অর্জুনের রথ নিয়ন্ত্রণ করতেন শ্রীকৃষ্ণ। কর্ণের
ক্ষেত্রে এক করুন বিয়োগের রথের কাহিনী জানা যায়। কিন্তু কাব্যের বাইরে আর একটা মহাভারতের পঞ্চরথ বা পাণ্ডবরথ আছে।

[ আরো পড়ুন ] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হীরের আংটি নিউ মার্কেটের দোকানে ?

বঙ্গোপসাগরের করমণ্ডল উপকূলের মহাবলীপুরমে অবস্থিত একটি স্মারক এলাকা। পঞ্চরথ ভারতের মনোলিথিক প্রস্তরখোদাই স্থাপত্য শিল্পকলার একটি নিদর্শন। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে পল্লব রাজা প্রথম মহেন্দ্রবর্মণ ও তাঁর পুত্র প্রথম নরসিংহবর্মণের রাজত্বকালে এই রথগুলি নির্মিত হয়।

Pancha Rathas of Mahabalipuram
Pancha Rathas of Mahabalipuram

পঞ্চরথ চত্বরের প্রতিটি স্মারক ঠিক রথের মতো দেখতে। প্রত্যেকটিই একটিমাত্র দীর্ঘ পাথর খোদাই করে তৈরী । সকল পাথরগুলি গ্র্যানাইট পাথর। এই স্মারকগুলির নামকরণ করা হয়েছে ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারত -এর পঞ্চপাণ্ডব ও তাঁদের সাধারণ স্ত্রী দ্রৌপদীর নামানুসারে। আকার অনুযায়ী এই রথগুলির নাম হল ধর্মরাজ রথ, ভীম রথ, অর্জুন রথ ,নকুল সহদেব রথ ও দ্রৌপদী রথ।

প্রতিটি আলাদা আলাদা নকশা অনুযায়ী তৈরী করে হয়েছে। এদের মধ্যে কোনোটি চৌকো, কোনোটি আয়তাকার, আবার কোনোটি গম্বুজাকার। তবে সবচেয়ে বড়োটির আকার ৪২ বাই ৩৫ ফুট আর উচ্চতম স্মারকটির উচ্চতা ৪০ ফুট।

পুরীর জগন্নাথ দেবের রথ:

রথযাত্রা আষাঢ় মাসের এক অন্যতম হিন্দু উৎসব। ভারতের প্রসিদ্ধ রথযাত্রা ওড়িশার পুরী শহরের জগন্নাথ মন্দিরের রথযাত্রা। উড়িষ্যার প্রাচীন পুঁথি ‘ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ’ এ আছে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল প্রায় সত্যযুগে। সে সময় উড়িষ্যা মালবদেশ নামে পরিচিত ছিল। মালবদেশের সূর্যবংশীয় পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে ভগবান বিষ্ণুর জগন্নাথরূপী মূর্তি নির্মাণ করেন এবং রথযাত্রারও স্বপ্নাদেশ পান।

[ আরো পড়ুন ] বিশ্ব শরণার্থী দিবস – উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা

পরবর্তীতে তাঁর হাত ধরেই পুরীতে জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন শুরু হয়। পুরীর তিন দেবতাকে গুণ্ডিচা মন্দিরে জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয়। পুরীতে যে রথগুলি নির্মিত হয় তাদের উচ্চতা ৪৫ ফুট।

Puri Rath Yatra
Puri Rath Yatra

স্কন্ধপুরাণে জগন্নাথদেবের রথযাত্রার কথা পাওয়া যায়। মহর্ষি জৈমিনি রথের আকার, সাজসজ্জা, পরিমাপ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন। প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলভদ্রের রথ। এই রথের নাম তালধ্বজ। এই রথটির চৌদ্দটি চাকা।ও উচ্চতা চুয়াল্লিশ ফুট। রথের আবরণের রঙ নীল। এরপর যাত্রা করে বোন সুভদ্রার রথ। রথের নাম দর্পদলন। উচ্চতা প্রায় তেতাল্লিশ ফুট। এই রথের মোট বারোটি চাকা।

এই রথটিকে পদ্মধ্বজও বলা হয়ে থাকে। রথের আবরণের রঙ লাল।একদম শেষে থাকে শ্রী কৃষ্ণ বা জগন্নাথদেবের রথ। রথটির নাম নন্দীঘোষ। এই রথের আর একটি নাম কপিধ্বজ। রথটির উচ্চতা পঁয়তাল্লিশ ফুট। এই রথে ষোলোটি চাকা আছে। রথটির আবরণের রঙ হলুদ।

এই প্রসিদ্ধ রথের বিভিন্ন অংশ আছে। রথ নির্মাতাকে বলে রথকর। রথচালককে বলে রথযুক। রথের চাকা কে বলে রথাঙ্গ। রথস্থ যোদ্ধাকে বলে রথিক। শরীর রক্ষার জন্য রথের মধ্যে গুপ্তস্থান কে বলে রথ গুপ্তি। রথের চাকা কে বলে রথচরন। ঘোড়া কালো রঙের। চারটি ঘোড়ার নাম ত্রিব্রা, ঘোরা। দীর্ঘশর্মা এবং স্বর্ণাভা। বলভদ্রের রথের সারথির নাম মাতলি। জগন্নাথের রথের রশির নাম শঙ্কচূড়। সুভদ্রার রথের রশির নাম স্বর্ণচূড় নাগিনী।

বলরামের রথের রশির নাম বাসুকিনাগ। জগন্নাথের রথের পতাকার নাম ত্রৈলোক্য মোহিনী। সুভদ্রা রথের পতাকার নাম নদাম্বিকা এবং বলরামের রথের পতাকার নাম উন্নয়নী। প্রত্যেকের পার্শ্ব দেবতা নয় জন।

কোন আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়া এই তিনটি রথ নির্মাণ করা হয়। উন্নত প্রযুক্তির বিন্দুমাত্র সহায়তা নেওয়া হয় না। রথ নির্মাণের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য মাপ হাতে নেওয়া হয়। কোনো গজ ফিতের সাহায্যে নেওয়ার নিয়ম নেই। পেরেক, নাট বল্টু, ধাতুর ব্যবহার করা যায় না। প্রায় ১৪০০ দক্ষ কর্মী রথ নির্মাণ করেন। আদিকাল থেকে বংশপরম্পরায় এই রথ তৈরি হচ্ছে। রথ তিনটিতে বলরাম, সুভদ্রা এবং জগন্নাথের মূর্তি নিমকাঠ দিয়ে তৈরি। প্রায় ২০৮ কেজি সোনা দিয়ে সজ্জিত তিন দেবতা। রথ নির্মাণের সমস্ত কাঠ আনা হয় দাশপাল্লা ও রানাপুরের জঙ্গল থেকে।

মাহেশের রথ:

মাহেশের রথযাত্রা ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথযাত্রা উৎসব। এই উৎসব ১৩৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুর শহরের মাহেশে অনুষ্ঠিত হয়। শ্রীরামপুরের মাহেশ জগন্নাথ দেবের মূল মন্দির থেকে মাহেশ গুন্ডিচা মন্দির (মাসীর বাড়ী) অবধি ৫০ ফুট উচ্চতার রথটি টেনে নিয়ে যাওয়া হয়।

চতুর্দশ শতকে ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী নামে এক সাধু পুরীতে তীর্থ করতে যান। তাঁর ইচ্ছা হয় জগন্নাথদেবকে নিজের হাতে ভোগ রেঁধে খাওয়াবেন। কিন্তু পুরীর মন্দিরের নিয়মে তিনি তা করতে পারলেন না। তিনি বাংলায় ফিরে আসেন। এক বর্ষার দিনে মাহেশ ঘাটে একটি নিমকাঠ ভেসে আসে। জল থেকে সেই কাঠ তুলে তিন দেবতার মূর্তি বানিয়ে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।

Rathyatra of Mahesh
Rathyatra of Mahesh

এরপর ১৭৫৫ সালে কলকাতার নয়নচাঁদ মল্লিক মাহেশে জগন্নাথ দেবের মন্দির তৈরি করেছিলেন। আর বর্তমানের রথটি প্রায় ১২৯ বছরের পুরনো। জানা যায়, সেই সময় ২০ হাজার টাকায় হুগলির দেওয়ান কৃষ্ণচন্দ্র বসু রথটি তৈরি করেন। এই প্রাচীন রথটিতে আছে ১২টি লোহার চাকা এবং দু’টি তামার ঘোড়া। প্রতি বছর রথের আগে বিগ্রহের অঙ্গরাগ হয়ে থাকে। স্নানপিড়ি ময়দানের সামনে থেকে জিটি রোড ধরে ১ কিলোমিটার পথ গিয়ে মাসিরবাড়ির মন্দিরে রথ পৌছায়।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, তার স্ত্রী মা সারদা দেবী, নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ কিংবদন্তিরা এই রথের মেলাতে আসেন। রথের সময় জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা লৌকিক দেবতা হয়ে ওঠেন। স্নানযাত্রার দিন ২৮ ঘড়া জল আর দেড় মন দুধ দিয়ে তিন বিগ্রহকে স্নান করানো হয়। ফলে দেবতারা জ্বরে পড়েন। সকল ভক্তকুলের বিশ্বাস, বিগ্রহের শরীরে হাত দিলে তাপ অনুভূত হয়।

আরামবাগ, গোঘাট, ঘাটাল থেকে কবিরাজের পাচ‌ন খেয়ে ভগবা‌ন‌ সুস্থ হন। শুশ্রূষার সময় জন সাধারণ মন্দিরে প্রবেশ করতে পারে না। রথযাত্রার এক দিন আগে মন্দির খোলে। সেই দিন রাজা হিসেবে অভিষেক হয় জগন্নাথের। বিখ্যাত এই অনুষ্ঠানের নাম ‘নব-কলেবর’। এরপর রথে চাপিয়ে তিন বিগ্রহকে জগন্নাথের সখী পৌর্ণমাসির কুঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয়। রথের টান থামে বন্দুকের গুলির শব্দে। সোজারথের ন’দিনের মাথায় হয় সেই উল্টোরথ।

মহিষাদলের রথ:

মহিষাদলের জমিদার বংশের রাজা আনন্দলালের স্ত্রী রানি জানকীর উৎসাহে ১৭৭৬ সালে এই রথযাত্রার প্রচলন হয়। মহিষাদলের রথযাত্রার সূচনা পর্ব নিয়ে বিতর্ক আছে। প্রামাণ্য ইতিহাস বলে, মহিষাদল রথযাত্রা শুরু করেছিলেন জনৈক মতিলাল পাঁড়ে যিনি রানি জানকী এবং প্রয়াত রাজা আনন্দলাল উপাধ্যায়ের পোষ্যপুত্র।

রানি জানকীর মৃত্যুর পর ১৮০৪ সালে এই রথের শুভ প্রবর্তন করেন। রানি জানকী সম্ভবত রথের পরিকল্পনা প্রথম করেন। এটি পূর্ব মেদিনীপুরের সব থেকে বড় রথ। বর্তমানে কাঠের পাঁচতলা রথটি তেরো চূড়া বিশিষ্ট। রথের দিন বিকেল তিনটেয় যাত্রা শুরু হয় পটকা ফাটিয়ে।

Mahishadal Rath Yatra
Mahishadal Rath Yatra

এটি একটি কাঠের তৈরী সতেরো চূড়ার রথ। সেই সময় এই রথ নির্মাণে খরচ হয়েছিল প্রায় ৬০০০ টাকা। প্রসিদ্ধ এই রথটি বর্গাকার হয়ে কৌণিক ভাবে উঠেছে। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৩২ ফুট। দ্বিতীয় তলের দৈর্ঘ ও প্রস্থ ২৫ ফুট। তৃতীয়তল ২০ ফুট, চতুর্থ তল ১৫ ফুট ও পঞ্চম তলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ১০ ফুট। চৌত্রিশটি চাকা উচ্চতায় চার ফুট আর পরিধি বারো ফুট।

আসলে চারখণ্ড কাঠ দিয়ে একএকটা চাকা তৈরি। প্রতিবছর অন্তত দুটো করে চাকা সঠিক ভাবে মেরামত করা হয়। গোটা রথে মোট বাহান্নটি খুঁটি আছে। আসল মজবুত চারটে খুঁটির মধ্যে থাকে ওপরে ওঠার সিঁড়ি।

মায়াপুরে ইসকনের রথ:

বাংলার আর এক বিখ্যাত রথ এই মায়াপুরের ইসকনের রথ। রাজাপুর মায়াপুর ইসকন মন্দির থেকে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রায় আসেন দেশ বিদেশের অগণিত মানুষ। জগন্নাথ, সুভদ্রা, বলদেব রথের দড়ি টানতে,ভিড় জমে যায়। সকালে হয় মঙ্গল আরতি,তারপর ভোগ নিবেদন ও তারপর আরও অনেক রীতির মাধ্যমে রথ টানা সূচনা হয়।

Mayapur ISKCON Rath Yatra
Mayapur ISKCON Rath Yatra

জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা রথে চড়ে রাজাপুর জগন্নাথ মন্দির থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের ইসকন চন্দ্রোদয় মন্দিরে ভক্তদের সাথে পৌঁছান প্রায় সন্ধ্যেবেলা। কাঠের রথগুলির নাম নন্দ ঘোষ, পদ্ম ধ্বজ ও তালধ্বজ, এই প্রসিদ্ধ রথ টানার আগে, পথকে সোনার ঝাড়ু দিয়ে সাফাই করা হয়।

গুপ্তিপাড়ার রথ:

গুপ্তিপাড়ার রথযাত্রা বাংলার অন্যতম বিখ্যাত রথ। ১৭৪০ সালে এই রথ উত্‍সব শুরু করেন মধুসুদানন্দ। ভান্ডার লুট গুপ্তিপাড়ার রথের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। গুপ্তিপাড়ার রথকে বলে বৃন্দাবন জীউর রথ। গুপ্তিপাড়ার রথের বৈশিষ্ঠ হল, উল্টো রথের দিন এখানে ভান্ডার লুট হয়। ভারতবর্ষের কোথাও এই ভান্ডার লুট হয় না। প্রতিবছর উল্টোরথের আগের দিন মাসির বাড়ির মন্দিরের তিনটি দরজা একসঙ্গে খেলা হয়। ঘরের ভিতর রকমারি খাবারের পদ মালসায় করে সাজানো থাকে।

Guptipara Rath Yatra
Guptipara Rath Yatra

এই মালসা ভোগ পাওয়ার জন্য দূরদূরান্ত করে কয়েক হাজার মানুষ উল্টোরথের আগের দিন প্রসাদ পাওয়ার জন্য গুপ্তিপাড়া আসেন। রথের দিন জগন্নাথ দেবকে অনবদ্য নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। জগন্নাথের মাসির বাড়িতে ৫২টি লোভনীয় সুস্বাদু পদে প্রায় ৪০ কুইন্টাল খাবারের ‘ভাণ্ডার লুট পালন করা হয়। ভান্ডার লুটের জন্য গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি, বেগুন ভাজা, কুমড়ো ভাজা, ছানার রসা, পায়েস, ক্ষীর, ফ্রায়েড রাইস, মালপোয়া, সন্দেশ, ও রাবড়ি সহ মোট ৫২টি পদে খাবার সহ প্রায় ৫৫০ টি মালসা তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি মালসা প্রায় ৫ থেকে ৮ কেজি করে খাবার থাকে।

বিষ্ণুপুরের রথ:

বিষ্ণুপুরের রথ মল্লবংশের ইতিহাসের সাক্ষী বহন করে। প্রায় ৩৫০ বছরের পুরোনো রথযাত্রা আজও সাড়ম্বরে পালিত হয়ে আসছে। ১৬৬৫ সালে মল্লরাজ বিরসিংহদেব মাকড়া পাথরের পাঁচচূড়া মন্দির বানিয়ে শুরু করেন রথযাত্রা। পরে মন্দিরের আদলে পিতলের রথ তৈরী করে রথযাত্রা উৎসব প্রচলন করেন মল্ল রাজারা। বিষ্ণুপুরে রথযাত্রায় উল্টো রথের জৌলুস বেশি। কৃষ্ণগঞ্জের আটপাড়া ও মাধবগঞ্জের এগারোপাড়ার মধ্যে চলে আলো,বাজনায়,সাজে-বাহারের প্রতিযোগিতা। মাধবগঞ্জের রথের অন্যতম বিশেষত্ব হল, এই রথে জগন্নাথ,বলরাম,সুভদ্রার বদলে সওয়ার হন পাঁচচূড়া মন্দিরের বিগ্রহ রাধা মদন গোপাল জিউ ঠাকুর।

বাংলাদেশের নাটোরের রথ:

প্রতিবেশী বাংলাদেশেও রথের প্রচলন আছে। নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার মাধনগর গ্রামে ১৮৬৭ সালে যামিনী সুন্দরী নির্মাণ করেন একটি পিতলের রথ। ব্যতিক্রমের এই রথটির উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। এর বেদীর আয়তন ১২ বর্গফুট। এই সুন্দর রথের ১২টি চাকা আছে। প্রত্যেক চাকার ভেতরে রয়েছে ১২টি পিতলের পাত। এছাড়া এই রথে আছে একডজন কোণ বা কর্ণার ও ১১২টি পিলার। মাধনগরের দেড়শ বছরের পুরনো রথটি নাটোরের বিশেষ ঐতিহ্যের। এটি বাংলাদেশের বৃহৎ ও প্রাচীনতম রথ। জানা যায়, ১৮৬৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত যামিনী সুন্দরী বসাক এর ব্যয়ভার বহন করতেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ও স্বাধীনতার পরে চুরির কবলে পড়ে রথট। নকশা, বিভিন্ন অংশ ও পিতলের তৈরি সারথিগুলো চুরি হলেও ২০১২ সালে সংস্কার করা হয় রথটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *