India Music History and Types of Music

ভারতীয় সংগীতের দর্পনে আজ বিশ্ব সংগীত দিবস

ইতিহাস বিনোদন

সংগীতের সূচনার সঠিক সময় সকলের অজানা। সাথে আছে ভারতের বৈচিত্রময় গানের ইতিহাস (India Music History)। সংগীত বা সুর বা স্বর এর প্রকাশ পদ্ধতিতে …

নিজস্ব প্রতিবেদন: আজ বিশ্ব সংগীত দিবস। ফরাসী ভাষায় একে বলা হয় “ফেট ডে লা মিউজিক”। ১৯৮২ সালে ফরাসি মন্ত্রী জ্যাক ল্যাং সর্বপ্রথম বিশ্ব সংগীত দিবস পালনের প্রস্তাব আনেন। ১৯৮৫ সালের ২১শে জুন প্রথম গোটা ইউরোপ এবং পরে সারা বিশ্ব এই সংগীত দিবস পালন করে। সেই থেকে আজকের দিনটি “বিশ্ব সংগীত দিবস” হিসেবে পালিত হয়। সাথে আছে ভারতের বৈচিত্রময় গানের ইতিহাস (India Music History)।

ফ্রান্স বহু বছর ধরে এই দিনে ঐতিহ্যবাহী মিউজিক ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করছে। ১৯৮২ সালে এসে এ ফেস্টিভ্যাল, ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে’-তে রূপান্তরিত হয়। ‘গান হতে হবে মুক্ত; সংশয়হীন’- এই স্লোগানকে ধরে বিশ্বের ১১০টি দেশ যোগ দেয় এই আন্দোলনে। ভুবনডাঙ্গায় তৈরী হয় এক সুরময় শান্তির ক্ষেত্র। যার ফলস্বরূপ আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানেও জায়গা করে নিয়েছে “মিউজিক থেরাপি”

World Music Day in France
World Music Day in France

সংগীতের সূচনার সঠিক সময় সকলের অজানা। আবছা আদিমতায় প্রকৃতিক বিষয় থেকেই সংগীতের উৎপত্তি। প্রস্তরযুগের মানুষেরা গান গাইতে পারতো। সেইসময় উদরচিন্তার বাইরে এসে মানুষ, সুরকে জাপ্টে ধরার চেষ্টা করে। নদী, ঝর্ণা,পাখি, বাতাস প্রভৃতি উপকরণ মানুষের কানে শব্দের এক অদ্ভুত অনুরণন তৈরী করে। জীব শ্রেষ্টর অবচেতন মনে দানা বাঁধতে থাকে সুর-তাল-লয়। প্রকাশ পায় বেঁচে থাকার এক অচেনা অবলম্বন।

সংগীতের সুর, তাল ও মাত্রা:

সংগীত বা সুর বা স্বর এর প্রকাশ পদ্ধতিতে ৭ টি চিহ্ন বা সংকেত ব্যবহৃত হয়। এরা হলো — সা রে গা মা পা ধা নি। এই সাতটি চিহ্ন দিয়ে সাতটি কম্পাংক নির্দেশ করা হয় । এছাড়াও আরও ৫টি স্বর আছে, যাদেরকে বিকৃত স্বর বলা হয়। তারা হল – ঋ জ্ঞ হ্ম দ ণ। সঙ্গীত সুন্দর হয় তাল, মাত্রা, লয় যোগে নির্দিষ্ট প্রণালীতে সম্পন্ন হলে। তাল হল সঙ্গীতের কোমল কঙ্কাল। বিভিন্ন রকম তাল ও মাত্রা আছে। এরা হলো — দাদরা ৬ মাত্রা ,কাহারবা ৮ মাত্রা , তেওড়া ৭ মাত্রা , রুপক ৭ মাত্রা , ঝাঁপতাল ১০ মাত্রা , ত্রিতাল ১৬ মাত্রা

সংগীতের প্রকারভেদ ও ধারা:

আছে বিভিন্ন প্রকার যান্ত্রীয় সঙ্গীত। এরা হলো তত – তার (তন্ত্রী) বিশিষ্ট, সুষির- বায়ু চালিত, ঘাতবাদ্য। এই ঘাতবাদ্য দুই প্রকারের ঘন (খঞ্জনি, করতাল, ঝাঁঝর, মন্দিরা) ও আনদ্ধ (তবলা, মৃদঙ্গ, পাখোয়াজ, খোল ঢাক, ঢোল, ডমরু, মাদল, ভেরী, কাড়া, নাকাড়া, দুন্দুভি, দামামা)

Types of Music
Types of Music

সঙ্গীতের অনেকগুলি ধারা আছে। প্রাচ্য সঙ্গীত ও পাশ্চাত্য সঙ্গীত, যন্ত্র সঙ্গীত কণ্ঠসঙ্গীত,শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, লোক সঙ্গীত আধুনিক সঙ্গীত। এছাড়া আছে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুংরী, টপ্পা, গজল, কাওয়ালী, কালোয়াতী ইত্যাদি। সামনে থেকে পরিবেশন করা সংগীত ( লাইভ) ছাড়া গ্রামোফোন কলের গান, ক্যাসেটের টেপ রেকর্ডার, সিডি প্লেয়ার, পেনড্রাইভ, আইপড, কম্পিউটার ও নেটের মোবাইল থেকে মানুষ প্রতিদিন সংগীতের সাথে বন্ধুত্ব তৈরী করছে।

[ আরো পড়ুন ] বিশ্ব শরণার্থী দিবস – উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা

ভারতীয় সংগীতের ইতিহাস:

মধ্য প্রদেশের ভীমবেতকা পাথর আশ্রয়স্থিত ৩০,০০০ বছর আগেকার গুহা চিত্রে সংগীতের বাদ্যযন্ত্র এবং নৃত্যভঙ্গিমা দেখা যায়। ২৫০০ খ্রিস্ট পূর্বে নৃত্যরত কন্যা স্থাপত্য দেখা যায়। সিন্ধু সভ্যতা যুগের মাটির পাত্রে পুরুষের কাঁধে ঢোল এবং মহিলাদের বাঁহাতে ড্রামের ছবি আছে। বৈদিক যুগে হিন্দুধর্ম বইতে তালা অথবা তাল পাওয়া যায়। বাল্মীকি রচিত রামায়ণে আছে নৃত্য ও সংগীত।

চোদ্দো শতকের অসমিয়া কবি মাধব কান্দালি লিখেছিলেন সপ্তকাণ্ড রামায়ণ। তিনি তার লেখা ‘রামায়ণে’ কিছু বাদ্যযন্ত্র আনেন। সেগুলি হলো – মার্দালা, খুমুচি, ভেমাচি, দাগার, গ্রাতাল, রামতাল, তবল, ঝাঁঝর, জিঞ্জিরি, ভেরি মহরি, তোকারি, দোসারি, কেন্দারা, দোতারা, বীণা, রুদ্র-বিপঞ্চি ইত্যাদি। এ থেকে বোঝা যায়, চোদ্দো শতক থেকে এসব বাদ্যযন্ত্র ভারতবর্ষের সংগীতের যুগে চালু ছিল।

ভারতীয় উচ্চাঙ্গ বা শাস্ত্রীয় সংগীত:

ভারতীয় সংগীতের আসল রত্ন এই উচ্চাঙ্গ বা শাস্ত্রীয় সংগীত। বিশ্বের সকল সংগীতের পাশে স্বতন্ত্র ধারা নিয়ে মাথা উঁচু করে বেঁচে আছে। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা ভারতে বৈদিক যুগ থেকে শুরু হয়। প্রায় ২০০০ বছরের পুরোনো এই চর্চা, মন্দিরে পরিবেশিত স্তোত্র হতেই সৃষ্টি হয়। সামবেদে সঙ্গীতকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত বিষয় হিসেবে ধরা হয়েছে।

এই উচ্চাঙ্গ সংগীতের দুটো প্রধান ঐতিহ্যের মধ্যে আছে কর্ণাটকি সংগীত এবং হিন্দুস্থানি সংগীত

১. কর্ণাটকি সংগীত:

কর্ণাটকি সংগীত চোদ্দো-পনেরো খ্রিস্টাব্দ এবং তার পরের কলা । বিজয়নগর সাম্রাজ্য শাসনের সময়কালে দক্ষিণ ভারতে এই সংগীতের প্রকাশ হয়। এর মধ্যে সমন্বয়ের সঙ্গে অলংকরণ সম্পাদন রাগ আল্পনা, কল্পনাস্বরম, নিরাভাল ধরনের সঙ্গে যোগ আছে। এই সংগীত প্রদর্শন করার সময় স্বরক্ষেপণের ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রায় ৩০০ রাগম বর্তমানে ব্যবহৃত হয়।

আন্নামায়া হলেন কর্ণাটকি সংগীতের প্রথম সংগীতজ্ঞ। পুরন্দরা দাসা কর্ণটকি সংগীতের জনক। ত্যাগরাজা, শ্যামা শাস্ত্রী এবং মুথুস্বামী দিক্ষিতা কর্ণাটকি সংগীতের তিন স্তম্ভ। প্রত্যেক বছর ডিসেম্বর মাসে চেন্নাই শহরে একটা দীর্ঘ আট সপ্তাহব্যাপী সংগীতের অধিবেশন হয়। এটি বিশ্বের দীর্ঘতম সংগীত মেলা

২. হিন্দুস্থানি সংগীত:

হিন্দুস্থানি সংগীতের ঐতিহ্য দীর্ঘ দিনের। ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতব্দীতে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধারার ঐতিহ্য বিস্তার করে। বৈদিক দর্শন, ভারতের দেশজ শব্দ সুর এবং পারস্যের সাঙ্গীতিক প্রভাবে ঋদ্ধ হয়েছে উত্তর ভারতের এই হিন্দুস্থানী উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। পারস্যের সাঙ্গীতিক প্রভাব এসেছে আফগান ও মুঘল সম্রাটদের মাধ্যমে। হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের মূল প্রেরণা হিন্দু ধর্মে নব রস হতে।

সাত সুর ও ২২টি শ্রুতির সমন্বয়ে আরোহণ অবরোহন বিন্যাস, বাদী ও সমবাদী স্বরের প্রয়োগ করা হয়। পন্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখন্ডে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রাগ সমূহকে দশটি ঠাট রূপে ভাগ করেছেন। এর আগে এগুলো বিভাজিত ছিল রাগ (পুরুষ), রাগিণী (স্ত্রী) এবং পুত্রা (সন্তান) হিসেবে। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সময় ও কাল নির্ভর রাগ রয়েছে প্রায় ৬,০০০ টি।

রবীন্দ্র সংগীত:

উচ্চাঙ্গ সংগীতের বাইরে এই রবীন্দ্রসংগীতে গোটা বিশ্ব, ভারতকে চিনতে পারে। রবীন্দ্রসংগীত হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক রচিত ও সুরারোপিত গান। বাংলা সংগীতের জগতে এই গানগুলি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত মোট গানের সংখ্যা ২২৩২টি।

তার গানের কথায় মধ্যে উপনিষদ‌, সংস্কৃত সাহিত্য, বৈষ্ণব সাহিত্য ও বাউল দর্শনকে পাওয়া যায়। আবার গানের সুরে ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি, টপ্পা, তরানা, ভজন ধারার সাথে বাংলার লোকসংগীত, কীর্তন, রামপ্রসাদী, পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব মেলে। এগারো বছর বয়সে লেখা ‘গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে’ গানটি সম্ভবত তার রচিত প্রথম গান।

তার গানে বিস্তার ব্যতিরেকেই সুর শব্দকে ছাড়িয়ে বিশেষ ব্যঞ্জনা তৈরী করে। প্রচলিত তালে সুর বাঁধার সঙ্গে সঙ্গে অপ্রচলিত নানা তাল তিনি ব্যবহার করেছেন। এই গান-ভাণ্ডারে ১৫ মাত্রা, ১৭ মাত্রা, ১৮ মাত্রা, ১৯ মাত্রা ইত্যাদির বাংলা গান আছে। ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত তিনি তৈরী করেন। বাংলা সিনেমায় নানা ভাবে রবীন্দ্রসংগীতের ব্যবহার হয়েছে।

রাজস্থানি সংগীত:

পশ্চিম ভারতের সংগীত যথেষ্ট সমৃদ্ধ। রাজস্থান রাজ্যের এক বিচিত্র ধরনের সাংস্কৃতিক সংগীতজ্ঞের প্রেক্ষাপট আছে। লঙ্গস, সপেরা, ভোপা, যোগী এবং মঙ্গনিয়ার জাতিগোষ্ঠীর সংগীতের ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই সংগীত আসলে একটা ঐকতানের বৈচিত্র্য নিয়ে ভাবাবেগকে বিস্তার করে। রাজস্থানের তান, হরেক যন্ত্রসংগীত থেকে আসে। এই বহুমুখী তারের বাজনার মধ্যে আছে সারেঙ্গি, রাবণাহাতা, কামায়াচা, মরসিং এবং একতারা

পার্কাসান বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে সবরকম আকারের নাগারা এবং ঢোল থেকে ছোটো ড্রাম ছিল। ডাফ এবং চ্যাং হল হোলি খেলার জনপ্রিয় যন্ত্রবাদ্য। বাঁশি এবং ব্যাগপাইপারগুলো এসেছে স্থানীয় উদ্যম (সানাই, পুঙ্গি, আলগোজা, তার্পি, বীণ এবং বাঙ্কিয়া) থেকে। রাজস্থানি সংগীত লোক সংগীতশিল্পীদের দ্বারা পরিবেশিত এক সম্মিলিত উদ্যোগ। ভারতীয় হিন্দি সিনেমাতে এই সংগীতের অনেক ব্যবহার আছে।

আসামের বিহু সংগীত:

উত্তর পূর্ব ভারতের সংগীতের ধারা একেবারেই স্বতন্ত্র। আসামের বিহু এই ধারাকে সুদূরপ্রসারী করেছে। ‘বিহু’ শব্দের উৎপত্তি নিয়ে মতান্তর আছে। সংস্কৃত ‘বিষুবত’ শব্দ থেকে বিহু শব্দের উৎপত্তি। অনেকের মতে, বিহু শব্দটি বৈ (উপাসনা) এবং হু (গরু) এই শব্দ দুটি থেকে এসেছে।

সংগীতকে ধরে বিহু অসমের জাতীয় উৎসব। এটি তিন প্রচার — ব’হাগ বিহু বা রঙ্গালী বিহু, কাতি বিহু বা কঙ্গালী বিহু এবং মাঘ বিহু বা ভোগালী বিহু। এই সংগীতের উৎসবের প্রথম দিনটা গোরু এবং মহিষদের জন্যে বরাদ্দ করা হয়। দ্বিতীয় দিনের উৎসব হল মানুষের জন্যে। বিহু উৎসবের বিষয় হলো বিহু নাচ এবং গান। এতে ঐতিহ্যপূর্ণ ড্রাম, ঢোল, শিঙা , গোগোনা বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

উত্তরাখণ্ডী সংগীত:

ভারতীয় সংগীতের ব্যাতিক্রমী ধারায় আছে উত্তরাখণ্ডী সংগীত। এই লোক সংগীতের মূল উৎস প্রকৃতি। ঐশ্বরিক সংগীতের অনুভব ও প্রকৃতি বিষয়ক এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সংগীত তৈরী হয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে বিশেষ করে নথিভুক্ত করা হয় এই লোক সংগীতের।

এই লোক সংগীত উত্তরাখণ্ড রাজ্যের জনগণের উৎসব, ধর্মীয় ঐতিহ্য, লোকগাথা এবং সরল জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। উত্তরাখণ্ডী লোক সংগীতের বাদ্যযন্ত হলো — ঢোল, দামৌন, তুরি, রনসিংহা, ঢোলকি, দাউর, থালি, ভাঙ্কোরা, মসক বাজা ইত্যাদি। তবে তবলা এবং হারমোনিয়াম ব্যবহৃত করা হয়।

এই সংগীতের প্রধান ভাষা হল কুমায়নি এবং গাড়োয়ালিনরেন্দ্র সিং নেগি, মোহন উপ্রেতি, গোপাল বাবু গোস্বামী এবং চন্দ্র সিং রাহী প্রমুখ গায়করা এই সংগীতকে উর্বর করেছেন।

পাঞ্জাব ও গুজরাটের ভাঙরা গিদ্ধা ডান্ডিয়া পাণ্ডবনি:

ভাঙরা ও গিদ্ধা মূলত পাঞ্জাবের সংগীত ও নৃত্যের বিষয়। ভাংড়া ভারত ও পাকিস্তানের পাঞ্জাব অঞ্চলের একটি একটি সংগীতের মোড়কে তৈরী লোকনৃত্য। বৈশাখী উৎসব উদযাপনের অঙ্গ হিসেবে এর জন্ম। শিখ সম্প্রদায় এই সংগীত-নৃত্যকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দরবারে তুলে ধরেছেন।

বর্তমান সাংগীতিক ধারাটা এসেছে সাধারণ ঐতিহ্য ছাড়া পাঞ্জাব প্রদেশের একটা জংলা অনুষঙ্গ থেকে, যাকে বলে সেম সেম। পাঞ্জাব অঞ্চল-এর মহিলা এই সংগীত মুখর নাচকে বলা হয় গিদ্ধা।

ডান্ডিয়া অথবা রাস হল দুহাতে দুটো কাঠির এল সংগীতময় গুজরাতি নৃত্য। বর্তমান সাংগীতিক ধারাটা ঐতিহ্যপূর্ণ লোকনৃত্যের সঙ্গত থেকে অনুগৃহীত। এর সাথে আর একটা ধারার নৃত্য এবং সংগীত হলো গরবা। পাণ্ডবনি একটা লোক সংগীত গায়কীর ধারা। ভীমকে নায়ক হিসেবে রেখে এই সংগীত তৈরী হয়।

ছত্তিশগড় রাজ্য এবং ওডিশা এবং অন্ধ্র প্রদেশের প্রতিবেশী উপজাতীয় অঞ্চলগুলোতে এই ধারার লোকসংগীত খুব জনপ্রিয়। এছাড়া লঙ্গাস, সাপেরা, ভোপা, যোগি এবং মঙ্গাইনার ইত্যাদি সংগীতের ধারাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

মহারাষ্ট্রের লাবনি:

একেবারে অন্যধারা নিয়ে বিখ্যাত মহারাষ্ট্রের লোক সংগীত লাবনি। এটি পশ্চিম ভারতের এক জনপ্রিয় লোক সংগীত। ঐতিহ্যগতভাবে, এই গান মহিলা শিল্পীরা গান। কিন্তু মাঝে মাঝে পুরুষ শিল্পীরাও এই গান গায়। লাবনি গানের সঙ্গে যে নাচের আকৃতি অনুষঙ্গ যুক্ত তাকে বলে তামাশা।

এই নাচের আকৃতিতে সূচিত নৃত্যশিল্পী (তামাশা বাঈ), সহ-নৃত্যশিল্পী – মাবশি, ড্রামবাদক – ঢোলকি এবং বাঁশি বাদক – বাঁশরি ওয়ালা খুব পরিচিত। এই লাবনি শব্দটি এসেছে ‘লাবণ্য’ শব্দ থেকে। সুন্দর ও জনপ্রিয় নৃত্য – সংগীতের একটা ধারা মহারাষ্ট্র রাজ্যে দেখা যায়। ন-গজ শাড়ি পরে আকর্ষণীয় মহিলারা সংগীতের সাথে নাচ প্রদর্শন করে। তারা একটা উত্তেজক গান গায়।

জানা যায়,মহারাষ্ট্র এবং মধ্য প্রদেশের শুকনো অঞ্চল থেকে এই সংগীতের উদ্ভব হয়েছে।

বাংলার কীর্ত্তন, বাউল ও ভাটিয়ালি:

প্রখ্যাত সংস্কৃত পন্ডিত জয়দেবের “গীতগবিন্দম”, কীর্তন গানের প্রকৃত উৎস। এছাড়াও বড়ু চন্ডিদাস, শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন, বিদ্যাপতি কীর্তন গান রচনা করেন। ১৫০০ শতকে শ্রীচৈতন্য ভক্তি সংগীতের এই ধারা প্রকট হয়। চৈতন্যের মৃত্যুর পর লীলা কীর্তনের আরও পাঁচটি ধারার সৃষ্টির হয়। এই ধারাগুলো হলো গাদানহাটি, মনোহর্ষী, রেনেটি, মান্দারনি এবং ঝাড়খান্ডি

১৬০০ শতকে নরোত্তম দাস গাদানহাটি ধারাটির সূচনা করেন। বর্ধমানের বিপ্রদাস ঘোষ সূচনা করেন রেনেটি ধারার। মান্দারান সরকার তৈরী করেন মান্দারনি কীর্তনের। ঝাড়খন্ডি কীর্তনের উদ্ভব হয় ঝাড়খন্ড জেলায়। কীর্তন সংগীত তিনটি তালে গাওয়া হয়, দ্রুত, মধ্য এবং বিলম্বিত। ১৮০০ শতকের গোড়ার দিকে পাঁচালী ও কীর্তন জনপ্রিয় হয়। কাজী নজরুল ইসলাম কিছু কীর্তন সংগীত তৈরী করেছেন।

বাংলার বাউল পৃথিবী বিখ্যাত। আঠারো, উনিশ, বিশ শতকে এই সংগীত প্রচার ও প্রসার পায়। একতারা এবং দোতারা নিয়ে বাউল লোক সংগীত গাওয়া হয়। ‘বাউল’ শব্দটা এসেছে সংস্কৃত বতুল শব্দ থেকে । এর অর্থ পবিত্রতা অসাধরণত্বে উৎসাহ দেয়। বাউলরা আসলে চারণ কবির একটা গোষ্ঠী। এরা হিন্দু তান্ত্রিক তথা সুফি অংশের দ্বারা প্রভাবিত।

ভাটিয়ালি এই ধরনের আবেগের লোকসংগীত। পূর্বের ‘বঙ্গদেশ’ বা এখনকার বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের মাঝি -জেলেরা এই সংগীত পরিবেশন করেন। ভাটিয়ালী অর্থাৎ নদীর স্রোতের টানে ভাটিয়ে যাওয়ার সুর এই গানে ছড়িয়ে আছে। নদীর স্রোতের সাথে মানুষের জীবনের চলার এক অপূর্ব সাদৃশ্য দেখা যায়। গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ নারীর প্রেমপ্রীতি, ভালবাসা, বিরহ, আকুলতা প্রকাশ পায় এই সংগীতে

চলচ্চিত্র, আধুনিক ও ব্যান্ড সংগীত:

ভারতীয় সংগীতকে বাণিজ্যিক ও চরম খ্যাতিতে পৌঁছে দিয়েছে সিনেমা ও আধুনিক গান। নানা ধরণের সংগীতের পরীক্ষা চলে এখানে। বর্তমান সময় ও পর্দার বিষয় ভেবে তৈরী হয় সংগীত। ছবির সাথে নায়ক-নায়িকাদের হাত ধরে জনপ্রিয় হয় এই সংগীত। প্রখ্যাত হিন্দি সংগীত স্রষ্টারা হলেন শচীন দেব বর্মন, শংকর জয়কিষান, রাহুল দেব বর্মন, মদন মোহন, নৌসাদ আলি, ওপি নায়ার, হেমন্ত কুমার, সি রামচন্দ্র, সলিল চৌধুরী, কল্যাণজি আনন্দজি, ইলাইয়ারাজা, এআর রহমান, যতীন ললিত, অনু মালিক, নাদিম-শ্রবণ প্রভৃতি।

রবি শংকর, বিলায়েৎ খান, আলি আকবর খান এবং রাম নারায়ণ প্রমুখ উচ্চাঙ্গ সংগীতের কিংবদন্তীরাও চলচ্চিত্রের জন্যে সংগীত রচনা করেছেন। প্রখ্যাত গায়করা হলেন জেসুদাস, মহম্মদ রফি, মুকেশ, এসপি বালাসুব্রহ্মনিয়াম, হেমন্ত কুমার, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, গীতা দত্ত, উদিত নারায়ণ, কুমার শানু, শান, কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, হরিহরণ, অরিজিৎ সিং প্রভৃতি।

সিনেমার বাইরেও অনেক ধরণের আধুনিক সংগীত তৈরী হয়েছে নানা ভাষায়। পশ্চিমি সংগীতের অনুকরন ও অনুসরণে তৈরী হয়েছে পপ-রক-ব্যান্ড সংগীত। আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের উচ্চমাত্রার ব্যবহার করা হয় এই সংগীতে। নেটিজেনদের কাছে খুন জনপ্রিয় এই সংগীত। এই ধারার সংগীতশিল্পীরা হলেন ঊষা উত্থুপ, শারন প্রভাকর, দালের মেহেন্দি, বাবা সাইগল, আলিশা চিনাই, কেকে প্রভৃতি।

বাংলা আধুনিক সংগীতের নতুন ধারা এনেছেন সুমন চ্যাটার্জী, নচিকেতা, অঞ্জন দত্ত, শিলাজিৎ, প্রতুল , রাঘব, রূপঙ্কর, শুভমিতা প্রমুখরা। দোহার, ভূমি, ক্যাকটাসের মতো ব্যান্ডের দল খুব বিখ্যাত হয়েছে।

কালের নিয়মে কথা, সুর, গায়কী ও প্রয়োগের বিবর্তন হয়েছে। সংগীতের মধ্যে মানুষ বেঁচে থাকবে। একমাত্র সংগীতই পারে, সীমান্তের কাঁটাতার সরিয়ে পৃথিবীর মানুষকে এক ছাতার তলায় আনতে।

[ আরো পড়ুন ] আন্তর্জাতিক নার্স দিবস ও ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল -এর জন্মদিন 

মনের গভীরের যেকোনো সত্ত্বার সাথে আপনজন হয়ে ওঠে সংগীত। এটি এক ধরনের শ্রবণযোগ্য শ্রুতিমধুর কলা। সুসংবদ্ধ শব্দ ও নৈশব্দের সমন্বয়ে বিনোদন তৈরী করতে সক্ষম। আসলে স্বর ও ধ্বনির সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় সংগীত। এই ধ্বনি মানুষের কণ্ঠ নিঃসৃত ও যন্ত্রের শব্দ থেকে অথবা উভয়ের সংমিশ্রণ হতে আসে। কিন্তু সকল ক্ষেত্রে সুর ধ্বনির প্রধান ও শক্তিশালী বাহন। সুর ছাড়াও সঙ্গীতের কাঠামোকে ধরে রাখে তাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *