World Refugee Day on June 20 each year

World Refugee Day: বিশ্ব শরণার্থী দিবস – উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা

ইতিহাস

গ্রোবালাইজেশনের মস্ত বোঝা শরণার্থী বা উদ্বাস্তু (World Refugee Day)। একজন ব্যক্তি নিজের বাসভূমি ছেড়ে অথবা আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য দেশে অস্থায়ীভাবে বাস করে।

নিজস্ব প্রতিবেদন: মানুষ হয়েও তারা মানুষের মর্যাদা পান না। মানুষ হয়ে বেঁচে থাকার মৈলিক অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত। সভ্য ও আধুনিক পৃথিবী, তাদের একঘরে করে রেখেছে। অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তারা নিরুদ্দেশের পথিক হয়ে ঘুরে বেড়ায়। সম্বল বলতে থাকে আকাশ, বাতাস আর মাটি। এরাই গ্রোবালাইজেশনের মস্ত বোঝা শরণার্থী বা উদ্বাস্তু (World Refugee Day)। একজন ব্যক্তি নিজের বাসভূমি ছেড়ে অথবা আশ্রয়ের সন্ধানে অন্য দেশে অস্থায়ীভাবে বাস করে।

যুদ্ধ ,জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রতা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শগত কারণে সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতা এর কারণ। শরণার্থীরা আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে পরিচিত হন। গোটা বিশ্বের কাছে এটা একটা অভিশাপ। দয়ার উপর তাদের কোনোক্রমে টিকে থাকতে হয়। আজ বিশ্ব শরণার্থী দিবস। মানুষ হয়ে মানুষের পাশে থাকবার দিন।

One of the images of European refugee crisis
One of the images of European refugee crisis

মহাকাশে, ভিন গ্রহে, অতল সমুদ্রে নামার গর্বিত ঘোষণার মাঝে, একদল হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। নাগরিক সমাজ তাদের দায়িত্ববোধ ভুলে যায়। তৈরী হয় এক অমানুষের পীঠস্থান। বিশ্বরাষ্ট্রসংঘ এই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছে। ২০০০ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৫৫/৭৬ ভোটে একটা বিষয় অনুমোদিত হয়।

২০০১ সালে থেকে প্রত্যেক ২০শে জুন আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত শরণার্থীদের অবস্থান নির্ণয় বিষয়ক একটি কনভেনশনের ৫০ বছর পূর্তি হয় ২০০১ সালে।

[ আরো পড়ুন ] বিশ্ব প্রবীণ নির্যাচন সচেতনতা দিবস

আসলে ২০০০ সাল পর্যন্ত “আফ্রিকান শরণার্থী দিবস” নামে একটি দিবস বিভিন্ন দেশে পালিত হয়। অর্গানাইজেশন অফ আফ্রিকান ইউনিটি পরবর্তীকালে ২০শে জুনকে আফ্রিকান শরণার্থী দিবস-এর পরিবর্তে “আন্তর্জাতিকভাবে শরণার্থী দিবস” পালন করতে সম্মত হয়।

Refugees of Uganda
Refugees of Uganda

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে অগণিত লোক শরণার্থী হয়। একমাত্র ইউরোপেই ৪০ মিলিয়নেরও অধিক লোক শরণার্থী ছিল। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি জাতিসংঘ ত্রাণ ও পুণর্বাসন প্রশাসন গঠন করে। এর প্রধান কাজ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন দেশসহ ইউরোপ ও চীন থেকে আগত শরণার্থীদের সাহায্য করা। তাদের নিয়ন্ত্রণে ও সহায়তায় ৭ মিলিয়ন লোক নিজ বাসভূমিতে ফেরে।

কিন্তু উদ্বাস্তু এক মিলিয়ন মানুষ তাদের দেশে ফিরতে অস্বীকার করে। বিশ্বযুদ্ধের শেষ মাসে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন জার্মান বেসামরিক নাগরিক পূর্ব প্রুশিয়া, পোমারানিয়া এবং সিলেসিয়া রাজ্য থেকে বার হয়। রেড আর্মির আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে ম্যাকলেনবার্গ, ব্রান্ডেনবার্গ এবং স্যাক্সনিতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নেয়।

Refugees during World War 2
Refugees during World War 2

যুগোস্লাভিয়া এবং রোমানিয়ার অগণিত জার্মানদের, সোভিয়েত ইউনিয়নে দাস শ্রমের জন্য ফেরত পাঠানো হয়। বিশ্বের ইতিহাসে এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি শরণার্থী স্থানান্তর প্রক্রিয়া। তথ্য বলছে, সেই সময় ১৫ মিলিয়ন জার্মানরাএতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

জল্পনার রোহিঙ্গা:

রোহিঙ্গা হলো পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি রাষ্ট্রবিহীন ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী। ২০১৬-১৭ মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের পূর্বে অনুমানিক ১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা মায়ানমারে বসবাস করত। ১৯৯১ ও ৯২ সালে আড়াই লক্ষাধিক মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থী মায়ানমার সামরিক শক্তির নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে চায়।

[ আরো পড়ুন ] বিশ্ব সাইকেল দিবস

দলবেঁধে মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। তাদের অনেকেই ২০ বছর বাংলাদেশে বসবাস করছে। বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে দু’টি ভাগে ভাগ করেছে। শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানকারী স্বীকৃত রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের সাথে মিশে যাওয়া অস্বীকৃত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

Rohingya Refugee Crisis
Rohingya Refugee Crisis

কক্সবাজারের নয়াপাড়া এবং কুতুপালং এলাকার দু’টি ক্যাম্পে ত্রিশ হাজার রোহিঙ্গা আছে। আরাকান রাজ্য থেকে গত কয়েক মাসে রোহিঙ্গারা অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছে বাংলাদেশে।

শরণার্থীদের মর্যাদা বিষয়ক সম্মেলন:

১৯৫১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক শরণার্থীদের মর্যাদা বিষয়ক সম্মেলন হয়। অনুচ্ছেদ ১এ-তে শরণার্থীর সংজ্ঞা তুলে ধরা হয়। একজন ব্যক্তি গভীরভাবে উপলদ্ধি করেন ও দেখতে পান পরিস্থিতি। তিনি জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় তাকে দেশের নাগরিকের অধিকার থেকে দূরে সরানো হয়। রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়। সেই সময় তিনি শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হন।

[ আরো পড়ুন ] আন্তর্জাতিক নার্স দিবস ও ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল -এর জন্মদিন 

উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা:

১৯৬৭ সালের সম্মেলনের খসড়া দলিলে উদ্বাস্তুর সংজ্ঞাকে প্রকাশ করা হয়। আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় আঞ্চলিক সম্মেলনে যুদ্ধ এবং অন্যান্য সহিংসতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেশত্যাগ করাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যুদ্ধের কারণে নির্যাতন-নিপীড়নে আক্রান্ত না হয়েও মাতৃভূমি পরিত্যাগ করেন বা জোরপূর্বক নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হন – তাহলে তারা শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।

UN Refugee Agency:

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ঘোষিত সর্বজনীন মানবাধিকারের ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, নিপীড়ন থেকে বাঁচতে অন্য দেশের আশ্রয় গ্রহণের অধিকার সবার আছে। ১৯৫১ সালে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংগঠন The UN Refugee Agency অন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনে ‘আন্তর্জাতিক শরণার্থী সনদ’ স্বাক্ষরিত হয়।

ভাইরাসের আবহাওয়াতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে এই দিনটির প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে “Every Action Counts ” বা সব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ২৫.৯ মিলিয়ন শরণার্থী বসবাস করছে। এ ছাড়া ৩.৫ মিলিয়ন মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আছে।

UNHCR still working on refugee crisis
UNHCR still working on refugee crisis

শরণার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশ পাঁচ দেশের অধিবাসী : সিরিয়া, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, মিয়ানমার ও সোমালিয়ার। শরণার্থীর সহায়তা করা সবার কর্তব্য। মানুষ হিসেবে শরণার্থীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা উচিত।

বিশ্বে ৭ কোটির বেশি মানুষ ঘরহারা:

সমগ্র পৃথিবী প্রযুক্তি ও আধুনিকতার র্শীষে উঠছে। এর পাশে প্রবাহিত হচ্ছে ঘরহারা মানুষের স্রোত। একই সাথে মাত্রা ছাড়িয়ে বাড়ছে শরণার্থীর সংখ্যা। বিশ্বায়নের এই যুগে যুদ্ধের হিড়িক বা বর্ণের উন্মত্ততায় শরণার্থী ও বাস্তুহারা মানুষ বাড়ছে। সারা বিশ্বে ৭ কোটির বেশি মানুষ ঘরহারা। গত প্রায় ৭০ বছরের মধ্যে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ। এই বাস্তুহারা মানুষদের মধ্যে অর্ধেক শিশু। এই বাস্তুচ্যুত ও শরণার্থীর বোঝা কোন উন্নত দেশ বহন করছে না।

উন্নয়নশীল দেশগুলোই বরং বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর বোঝা বহন করছে। এইমুহূর্তে বাংলাদেশে, ১১ লাখের বেশি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা আছে। ২০১৮ সালে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ৭ কোটি ৮০ লাখ। যা ২০১৭ সালের চেয়ে সংখ্যায় ২কোটি ৩০ লাখ বেশি। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে ৩৭ হাজার মানুষ বাড়ি-ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। এ সংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার তুলনায় বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

[ আরো পড়ুন ] আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রেসেন্ট অভিযানের নীতি 

১৯৯২ সালে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার তুলনায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল। সেই সময় গড়ে প্রতি ১০০০ জনে ৩ দশমিক ৭ জন বাস্তুচ্যুত হত। কিন্তু ২০১৮ সালে ওই সংখ্যা পৌঁছায় ৯ দশমিক ৩। যুদ্ধ, সংঘাত বা নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাড়ি-ঘর ছেড়ে পালানো শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৫৯ লাখ। এর মধ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থী ৫৫ লাখ। নিজেদের জন্মভূমি ছেড়ে নানা দেশে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ।

গৃহহীন মানুষ যারা বাস্তুচ্যুত হয়ে নিজের দেশের ভেতরই আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের সংখ্যা ৪ কোটি ১৩ লাখ। সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন সিরিয়ার নাগরিক – ৬৭ লাখ এবং আফগানিস্তানের – ২৭ লাখ। ২০১৭ সালে প্রতি দু’সেকেন্ডে একজন বাস্তুচ্যূত হয়েছে। মিয়ানমার, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, সিরিয়াসহ কয়েকটি দেশ থেকে অনেক মানুষ বাসভূমি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।

জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতরেসে জানিয়েছেন, সেই সব দেশগুলোর মানবিকতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে যারা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। শরণার্থীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শান্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *